শেষ বিকেলের মেঘ

অনেকদিন পর ফিরে আসা পুরনো বাড়িতে, অমল খুঁজে পায় হারিয়ে যাওয়া বিকেলগুলোর ছায়া।

২ মিনিটে পড়া যাবে
শেষ বিকেলের মেঘ

বিকেল চারটায় ট্রেন থেকে নামল অমল। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাল। কিছুই বদলায়নি। সেই একই হলুদ রঙের বেঞ্চ, সেই একই বুড়ো বটগাছ, সেই একই ধুলোমাখা রাস্তা।

পনেরো বছর।

পনেরো বছর পর ফিরে এসেছে অমল তার জন্মভূমিতে। কলকাতার ব্যস্ততায়, অফিসের চাপে, সংসারের টানাপোড়েনে — এই গ্রামটাকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সে।

কিন্তু গতকাল রাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছিল। দেখেছিল ছোটবেলার সেই বিকেলগুলো — যখন মাঠে গরু চরাতে যেত, যখন পুকুরে সাঁতার কাটত, যখন ঠাকুমার কোলে শুয়ে গল্প শুনত।


স্টেশন থেকে বাড়ি পর্যন্ত দুই কিলোমিটার পথ। একসময় এই পথ পায়ে হেঁটে যেত অমল, দৌড়ে যেত। আজ রিকশায় বসে যেতে যেতে দুপাশে তাকায়।

রহিম চাচার চায়ের দোকান এখনও আছে। কিন্তু রহিম চাচা নেই — তাঁর ছেলে এখন দোকান চালায়। পোস্ট অফিসের লাল বাক্সটা মরচে ধরেছে। প্রাথমিক স্কুলের দেওয়ালে নতুন রং, কিন্তু ভেতরের কোলাহল সেই একই।

“বাবু, কোন বাড়ি?” রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করল।

“পকুরপাড়ের চক্রবর্তী বাড়ি,” অমল বলল।

রিকশাওয়ালা একটু অবাক হয়ে তাকাল। “ও বাড়ি তো অনেকদিন বন্ধ।”

“জানি,” অমল চুপচাপ বলল।


বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে অমলের মনে হলো, সময় যেন থমকে গেছে। মরচে-ধরা লোহার গেট, ঘাসে ঢাকা উঠোন, দেওয়ালে শ্যাওলার দাগ। কিন্তু বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে — কোনোমতে হলেও দাঁড়িয়ে আছে।

চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলতেই একটা ধুলোর গন্ধ নাকে এসে লাগল। আর সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এল সেই স্মৃতি — ঠাকুমার পান খাওয়ার গন্ধ, মায়ের রান্নার গন্ধ, বাবার বইয়ের তাকের কাগজের গন্ধ।

অমল ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়াল। প্রতিটি ঘরে একটা করে স্মৃতি জমে আছে — যেন সিন্দুকে তালা দেওয়া পুরনো চিঠির মতো।

বারান্দায় এসে দাঁড়াল। পশ্চিমের আকাশে সূর্য ঢলে পড়ছে। মেঘগুলো কমলা আর বেগুনি রঙে রাঙা হয়ে উঠেছে — ঠিক যেমনটা ছোটবেলায় দেখত।

শেষ বিকেলের মেঘ।

অমল বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ দুটো ভিজে আসছিল।

সে জানত, সে আবার চলে যাবে। কলকাতায়, কাজে, সংসারে। কিন্তু এই বিকেলটা — এই মেঘ, এই আলো, এই নিস্তব্ধতা — এটা সে রেখে দেবে বুকের ভেতর। চিরকালের মতো।


ফেরার ট্রেনে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অমল ভাবল, বাড়ি আসলে একটা জায়গা নয়। বাড়ি হলো সেই সময়, সেই মানুষ, সেই বিকেল — যা আর ফেরে না, কিন্তু হারায়ও না।

শেষ বিকেলের মেঘ জানালায় ভেসে গেল, আর অমল চোখ বন্ধ করে শুনতে পেল ঠাকুমার গলা — “ঘুমিয়ে পড়, খোকা। কাল সকালে উঠে খেলবি।”

অমল হাসল। কাল সকাল অনেক দূরে।