সাক্ষাৎকার গ্রহণ: তানিয়া আহমেদ
স্থান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ক্যান্টিন
তারিখ: ফেব্রুয়ারি ২০২৬
তানিয়া: কবিতা লেখা শুরু হলো কীভাবে? প্রথম কবিতার কথা মনে আছে?
জাহিদ: মনে আছে, খুব ভালো করে মনে আছে। ক্লাস নাইনে পড়ি। বর্ষাকালে স্কুলের ছাদে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম। হঠাৎ মনে হলো — এই যে জলের ধারা নামছে, এটা তো কেউ লিখছে, আকাশ লিখছে মাটির ওপর। আমিও লিখতে চাই। সেদিন রাতে খাতায় প্রথম কবিতা — “বৃষ্টি তুমি কার চিঠি?” এখন পড়লে হাসি পায়, কিন্তু সেই মুহূর্তের সততা ছিল।
তানিয়া: আপনার কবিতায় শহরের ছবি খুব স্পষ্ট। রিকশা, ফুটপাত, চায়ের দোকান — এগুলো কি সচেতন পছন্দ?
জাহিদ: না, এটা সচেতন নয়। আমি শহরের ছেলে — ঢাকায় জন্ম, ঢাকায় বড় হওয়া। আমি যা দেখি, তাই লিখি। জীবনানন্দ গ্রামের ধানক্ষেত ও নদী নিয়ে লিখেছেন কারণ সেটা তাঁর দেখা পৃথিবী। আমার পৃথিবী হলো কাঁটাবনের মোড়, মিরপুরের বাসের ভিড়, চারুকলার এই ক্যান্টিন। কবিতা তো জীবন থেকে আসে — কবির জীবন যেখানে, কবিতাও সেখানে।
তানিয়া: আজকের তরুণ কবিদের সম্পর্কে কী বলবেন?
জাহিদ: তরুণরা ভালো লিখছে — অনেকে খুব ভালো। কিন্তু একটা কথা বলব — তাড়াহুড়ো করো না। কবিতা পাকতে সময় লাগে, ফলের মতো। কাঁচা আম তুলে ফেললে তো কষ্টে কষ্টে টক লাগে। কবিতাও তাই — লেখো, তারপর রেখে দাও কিছুদিন, তারপর আবার পড়ো। যে লাইনটা তখন দারুণ লেগেছিল, দুদিন পর দেখবে অপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে। সেটাই তো সম্পাদনা।
তানিয়া: সোশ্যাল মিডিয়ায় কবিতা প্রকাশ — এটাকে কীভাবে দেখেন?
জাহিদ: দুটো দিক আছে। ভালো দিক হলো — কবিতা এখন বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। আগে লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা ছাপা হলে একশো দুশো জন পড়ত। এখন ফেসবুকে একটা কবিতা দিলে হাজার হাজার মানুষ পড়ে। এটা ভালো।
খারাপ দিক হলো — ইনস্ট্যান্ট প্রতিক্রিয়ার নেশা। লাইক, কমেন্ট — এসব কবিতার মান নির্ধারণ করে না। কিন্তু অনেক তরুণ কবি এই ফাঁদে পড়ছে। মনে রাখতে হবে — জীবনানন্দ জীবদ্দশায় তেমন পাঠক পাননি। তাতে কি তাঁর কবিতার মূল্য কমেছে?
তানিয়া: আপনার প্রিয় বই কোনটি?
জাহিদ: একটা বই বলা কঠিন। কিন্তু যদি একটাই বলতে হয় — জীবনানন্দের “বনলতা সেন”। এই বই বারবার পড়ি, আর প্রতিবার নতুন কিছু পাই। এটাই তো মহৎ সাহিত্যের লক্ষণ — অন্তহীন পাঠের সম্ভাবনা। আর বাংলাদেশের সাহিত্য থেকে শহীদুল জহিরের “সে রাতে পূর্ণিমা ছিল” — এই উপন্যাস পড়লে মনে হয় ঢাকার পুরনো গলি জীবন্ত হয়ে ওঠে।
তানিয়া: কবিতা কি সমাজ বদলাতে পারে?
জাহিদ: সরাসরি? সম্ভবত না। কবিতা বিপ্লব আনে না, আইন বদলায় না। কিন্তু কবিতা মানুষের মন বদলায়, দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়। একটা ভালো কবিতা পড়ে যদি কেউ একটু থামে, একটু ভাবে, পৃথিবীকে একটু অন্যভাবে দেখে — সেটাই তো কবিতার কাজ। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষার জন্য শহীদরা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন কবিতাতেই বেঁচে আছে।
তানিয়া: শেষ প্রশ্ন — নতুন কবিদের জন্য একটি পরামর্শ?
জাহিদ: পড়ো। শুধু কবিতা নয় — গল্প পড়ো, উপন্যাস পড়ো, ইতিহাস পড়ো, দর্শন পড়ো। আর যতটা পড়ো, তার চেয়ে বেশি দেখো ও শোনো। রাস্তার মানুষের কথা শোনো, বাসে-রিকশায় মানুষের মুখ দেখো। কবিতা তো শেষ পর্যন্ত মানুষেরই কথা।
তানিয়া: অনেক ধন্যবাদ, জাহিদ ভাই।
জাহিদ: ধন্যবাদ তোমাকেও। চলো, আরেক কাপ চা হোক।

মন্তব্য