পুরনো ডায়েরির পাতা

এক পুরনো ডায়েরির পাতায় লুকিয়ে থাকা প্রেমের গল্প — যা সময়ের সঙ্গে মুছে যায়নি।

২ মিনিটে পড়া যাবে
পুরনো ডায়েরির পাতা

ঘরটা গোছানোর সময় আলমারির পেছন থেকে বেরিয়ে এল একটা নীল মলাটের খাতা। ময়লা, জীর্ণ, কোণা ভাঁজ হয়ে যাওয়া। মেঘলা সেটা হাতে তুলে নিতেই ধুলোর গন্ধ নাকে এল — আর সঙ্গে সঙ্গে কেমন যেন একটা অচেনা-চেনা অনুভূতি বুকের মধ্যে নড়ে উঠল।

খাতার প্রথম পাতায় লেখা — “সুপ্রিয়ার ডায়েরি, ১৯৮৯”।

সুপ্রিয়া। মেঘলার মা। যে মা মেঘলার তেরো বছর বয়সে চলে গেছে চিরকালের মতো।


পাতা উল্টাতে লাগল মেঘলা। মায়ের হাতের লেখা — সরু, ঝরঝরে, একটু ডানদিকে হেলে যাওয়া। যেন লেখাগুলো হাঁটছে কোথাও।

১২ জানুয়ারি, ১৯৮৯

আজ কলেজে নতুন একজন এসেছে। নাম অনিকেত। কেমিস্ট্রি বিভাগে। বেশ চুপচাপ ছেলে। লাইব্রেরিতে দেখলাম — একা একা বসে জীবনানন্দ পড়ছে। কেমিস্ট্রির ছেলে জীবনানন্দ পড়ে?

মেঘলা মৃদু হাসল। মায়ের কৌতূহল যেন পাতা থেকে ঝরে পড়ছে।

৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৯

আজ লাইব্রেরিতে আবার দেখা। ও আমাকে কবিতার বই দিয়ে বলল — “এটা পড়বেন? শক্তি চট্টোপাধ্যায়।” আমি নিলাম। হাত একটু কাঁপছিল, কেন জানি না।

১৮ মার্চ, ১৯৮৯

অনিকেত আজ বলল, “তোমার চুলে সন্ধ্যামালতীর গন্ধ।” আমি কিছু বলতে পারিনি। শুধু হেঁটে চলে এসেছি। কিন্তু পা দুটো কেমন ভারী লাগছিল — থামতে চাইছিল।


পাতার পর পাতা পড়ে যায় মেঘলা। এক অব্যক্ত প্রেমের গল্প ফুটে উঠতে থাকে এই ডায়েরির পাতায়। সরস্বতী পূজোর দিন চুরি করে দেখা, বর্ষায় ছাতা ভাগাভাগি, পরীক্ষার আগে নোটস বিনিময়।

আর তারপর — হঠাৎ করে থেমে যাওয়া।

৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৯

বাবা বললেন, বিয়ে ঠিক হয়েছে। ব্যাংকে চাকরি করে ছেলে। ভালো পরিবার। আমি কিছু বলিনি। কী বলব? অনিকেতকে? তাকে তো আমি কোনোদিন বলতেই পারিনি যে…

থাক। কিছু কথা না বলাই ভালো।

এরপর আর কোনো এন্ট্রি নেই এক মাস। তারপর শুধু একটা লাইন:

১১ অক্টোবর, ১৯৮৯

আজ বিয়ে। অনিকেত স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখেছি। ও একটা বই ধরে ছিল — বোধহয় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই বইটা। ট্রেন ছেড়ে দিল।


মেঘলা ডায়েরিটা বন্ধ করে কোলের ওপর রাখল। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।

বাবা — অনিকেত নয়, ব্যাংকের সেই ভদ্রলোক — পাশের ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। চা খাচ্ছেন। প্রতিদিনের মতো।

মেঘলা জানে, বাবা ভালো মানুষ। সংসার দিয়েছেন, যত্ন দিয়েছেন। কিন্তু মায়ের ডায়েরি পড়ে আজ সে বুঝল — তার মা সারাজীবন একটা না-বলা কথা বুকে নিয়ে বেঁচেছিল।

সে ডায়েরিটা আলমারির পেছনেই রেখে দিল। কিছু গল্প সেখানেই থাকুক — ধুলোয়, অন্ধকারে, পুরনো পাতায়।

বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। মেঘলা জানালা খুলে বৃষ্টির গন্ধ নিল। মনে মনে ভাবল, মা, তুমি কি সুখে ছিলে?

উত্তর কেউ দিল না। শুধু বৃষ্টি পড়ে চলল।