অনুবাদকের ভূমিকা
পাবলো নেরুদা (১৯০৪-১৯৭৩) — চিলির নোবেলজয়ী কবি, যাঁর কবিতা ভালোবাসা, রাজনীতি ও প্রকৃতির এক অসামান্য মিশ্রণ। তাঁর “Veinte Poemas de Amor y una Canción Desesperada” (বিশটি প্রেমের কবিতা ও একটি হতাশার গান) বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ।
এখানে মূল স্প্যানিশ থেকে কয়েকটি কবিতার বাংলা অনুবাদ উপস্থাপন করা হলো। অনুবাদে চেষ্টা করা হয়েছে নেরুদার কবিতার আবেগ ও চিত্রকল্পের সঙ্গে বাংলা ভাষার নিজস্ব সুর মেলানো।
কবিতা ১৫: আমি তোমার নীরবতা ভালোবাসি
আমি তোমার নীরবতা ভালোবাসি, কারণ তুমি যেন অনুপস্থিত, আমার কথা শোনো দূর থেকে, আর আমার স্বর তোমাকে ছুঁতে পারে না। মনে হয় তোমার চোখ দুটো উড়ে গেছে কোথাও আর মনে হয় এক চুমু বন্ধ করে দিয়েছে তোমার মুখ।
যেহেতু সবকিছু পরিপূর্ণ আমার আত্মায় তুমি ফুটে ওঠো তার গভীর থেকে, ভরে দাও সবকিছু। প্রজাপতি স্বপ্নের মতো তুমি আমার আত্মার সঙ্গী আর তুমি বিষণ্ণতার মতো — যেন একটি শব্দ।
আমি তোমার নীরবতা ভালোবাসি, তুমি যেন দূরে, তুমি যেন কাঁদছ, প্রজাপতি কুয়াশায় গুঞ্জরণ। দূর থেকে তুমি আমাকে শোনো, আমার স্বর তোমাকে পায় না: আমাকে ডুবে যেতে দাও তোমার নৈঃশব্দ্যে।
আমাকে কথা বলতে দাও তোমার নীরবতা দিয়ে, স্বচ্ছ যেন প্রদীপ, সরল যেন আংটি। তুমি রাতের মতো, নিশ্চুপ আর তারায় ভরা। তোমার নৈঃশব্দ্য তারার — এতটাই দূর ও সরল।
কবিতা ২০: আজ রাতে আমি সবচেয়ে বিষণ্ণ কবিতা লিখতে পারি
আজ রাতে আমি সবচেয়ে বিষণ্ণ কবিতা লিখতে পারি।
লিখতে পারি, যেমন — “রাত তারায় তারায় ছিটকে আছে, আর নীল তারারা কাঁপছে দিগন্তে, দূরে।”
রাতের বাতাস আকাশে ঘুরে ঘুরে গান গায়।
আজ রাতে আমি সবচেয়ে বিষণ্ণ কবিতা লিখতে পারি। আমি তাকে ভালোবাসতাম, কখনো কখনো সেও আমাকে ভালোবাসত।
এরকম রাতে আমি তাকে বাহুতে ধরেছিলাম। অনন্ত আকাশের নীচে আমি তাকে বারবার চুম্বন করেছিলাম।
সে আমাকে ভালোবাসত, কখনো আমিও তাকে ভালোবাসতাম। কী করে তার পরিবর্তনহীন চোখকে ভালো না বেসে থাকা যায়।
আজ রাতে আমি সবচেয়ে বিষণ্ণ কবিতা লিখতে পারি। জানা যে সে নেই। অনুভব করা যে আমি তাকে হারিয়েছি।
বিস্তীর্ণ রাতের কথা শোনা, তাকে ছাড়া আরো বিস্তীর্ণ। আর কবিতা পড়ে যায় আত্মায় — শিশিরের মতো ঘাসে।
অনুবাদ প্রসঙ্গে
নেরুদার কবিতা অনুবাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাঁর কবিতার শরীরী অনুভূতি। স্প্যানিশ ভাষায় যে ধ্বনিময়তা ও তরঙ্গ আছে, বাংলায় তার হুবহু প্রতিরূপ তৈরি করা সম্ভব নয়। তবে বাংলা ভাষার নিজস্ব যে মাধুর্য আছে — তার সঙ্গে নেরুদার আবেগ মেলানো চেষ্টা করা হয়েছে।
অনুবাদ সবসময়ই একটি পুনর্সৃষ্টি। আশা করি এই পুনর্সৃষ্টি পাঠকদের নেরুদার কবি-মনের কাছাকাছি নিয়ে যাবে।
