এই ধারাবাহিকে প্রতি মাসে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হবে।
দিন ১: পৌঁছানো
হাওড়া থেকে শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস। সকাল সাতটার ট্রেন। জানালার ধারের সিট পেয়েছি — এটাই ভ্রমণের অর্ধেক আনন্দ।
শহর ছাড়াতেই চেহারা বদলে যায় বাংলার। কংক্রিটের জায়গায় সবুজ, শব্দের জায়গায় নিস্তব্ধতা। বর্ধমান পেরিয়ে বোলপুর যত কাছে আসে, লাল মাটির রং যেন গাঢ় হয়। শীতের সকালে কুয়াশার চাদর — তার ভেতর দিয়ে ট্রেন চলেছে যেন স্বপ্নের ভেতর দিয়ে।
বোলপুর স্টেশনে নামতেই একটা অন্যরকম হাওয়া গায়ে এসে লাগল। এটা শহরের হাওয়া নয়, এতে গাছের গন্ধ, মাটির গন্ধ, আর বহু পুরনো একটা গান মিশে আছে।
হোটেলে চেক-ইন করে সোজা বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য — আমার বাগান, বিশ্বভারতীর ক্যাম্পাস।
ক্যাম্পাসে ঢুকতেই মনে হলো — সময় এখানে একটু ধীরে চলে। ছাতিমতলায় দাঁড়িয়ে উপরের দিকে তাকালাম — পাতার ফাঁক দিয়ে আকাশ ঝরে পড়ছে। এই গাছের নীচেই তো রবীন্দ্রনাথ বসতেন। এই মাটি তাঁর পায়ের ছোঁয়া পেয়েছে।
সন্ধ্যায় খোয়াই-এ গেলাম। লাল মাটির ঢিবি, তার ওপর শেষ বিকেলের আলো — যেন কেউ সোনার জল ঢেলে দিয়েছে। কিছু শিশু ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। দূরে একটা বাউলের গান শোনা যাচ্ছে, কথা বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু সুর বুকে এসে লাগছে।
দিন ২: ঘুরে বেড়ানো
সকালে কলাভবনে গেলাম। নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর বেইজ — এঁদের শিল্পকর্ম দেখলাম। রামকিঙ্করের “সাঁওতাল পরিবার” ভাস্কর্যটির সামনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। ব্রোঞ্জের এই পরিবার — বাবা, মা, সন্তান, কুকুর — সরল অথচ কত গভীর। জীবনের সারবস্তু যেন ধরা পড়েছে এই কটি মূর্তিতে।
দুপুরে একটি স্থানীয় ছোট হোটেলে খেলাম — ভাত, ডাল, আলুপোস্ত, পাঁপড়ভাজা। সাধারণ খাবার, কিন্তু শান্তিনিকেতনের মাটিতে বসে খেলে তার স্বাদ যেন আলাদা।
বিকেলে সোনাঝুরির হাটে গেলাম। প্রতি শনিবার এখানে বিশাল হাট বসে — বাউল গান, হস্তশিল্প, বাটিক, মাটির কাজ। মানুষের ভিড়, কিন্তু কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সবাই যেন একটু সময় নিয়ে, একটু থেমে থেমে।
একটি বাউল গান শুনলাম — “মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে, আমি আর বাইতে পারলাম না।” গানটা যে গাইছিলেন তাঁর চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি ছিল — যেন তিনি গান গাইছেন না, প্রার্থনা করছেন।
দিন ৩: ফেরার আগে
শেষ দিন। সকালে পৌষমেলার মাঠে গেলাম। মেলা নেই, কিন্তু খোলা মাঠটা দেখলাম। কল্পনায় দেখতে পেলাম পৌষের সেই উৎসব — বাউল, যাত্রা, মেলার আলো। রবীন্দ্রনাথ এই মেলার সূচনা করেছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন — উৎসব মানুষকে কাছে আনে।
ফেরার ট্রেনে জানালার ধারে বসে ভাবলাম — শান্তিনিকেতন শুধু একটি জায়গা নয়, এটি একটি ধারণা। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের শিক্ষা, শিল্পের সঙ্গে জীবনের মিলন। সেই স্বপ্ন কি আজও বেঁচে আছে?
মনে হলো — হ্যাঁ, আছে। খোয়াই-এর লাল মাটিতে, ছাতিমতলার ছায়ায়, বাউলের গানে, আর প্রতিটি মানুষের চোখে যারা এখানে আসে কিছু খুঁজতে — হয়তো নিজেকেই।
পরবর্তী পর্ব: মুর্শিদাবাদের রাজপ্রাসাদ ও ইতিহাসের পদচিহ্ন
