সুখে থাকা

ভালোবাসার মানুষ হারিয়ে গেলে মানুষ নতুন আশ্রয় খোঁজে, কিন্তু সেই আশ্রয়ও কখনো কখনো নিঃশব্দে সরে যায়। একাকীত্বের গল্প শেষ হয় না - শুধু চরিত্র বদলায়।

৭ মিনিটে পড়া যাবে
সুখে থাকা

সুখে থাকা

ইকবাল করিম অফিস থেকে উঠে বাসায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো।

“আপনার অফিস কি বন্ধ হয়ে গেছে?”

“আমাদের নাইট শাখা খোলা আছে,” উত্তর দিলেন ইকবাল করিম।

“আপনার অফিসে একটু দরকার। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে চলে আসছি।” বলেই ফোন রেখে দিলেন। মতামত নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না ভদ্রমহিলা।

দশ মিনিট পর টেলিফোনের সেই মহিলা ইকবাল করিমের চেম্বারে প্রবেশ করলেন। ভদ্রমহিলা বললে কেমন একটা বয়স্ক মানুষের চেহারা চোখে ভাসে। কিন্তু যিনি রুমে ঢুকলেন তাকে ভদ্রমহিলা বললে মানায় না। আবার তরুণীও বলা যাবে না। এই দুইয়ের মাঝামাঝি কিছু একটা বলা যায়। অসম্ভব রূপসী।

উনি অফিসে আসার কারণ বললেন — পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনবেন।

“আজকে তো হবে না, আগামীকাল আসেন,” বললেন ইকবাল করিম।

“আগামীকালই আসবো। কিন্তু দ্রুত আমার কাজটা করে দিতে হবে। আমি অফিস থেকে আসবো, দ্রুত কাজ সেরে চলে যাবো।”

চা-বিস্কুট অফার করলেন ভদ্রমহিলাকে। খেতে খেতে টেবিলের বইয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “আপনি এতো বই পড়েন?”

“পড়ি টুকটাক। স্কুল জীবন থেকে এই অভ্যাসটা চলে আসছে।”

“আমিও বই পড়তে খুব ভালোবাসি।” কিছুটা লাজুক ভঙ্গিতে মৃদু হেসে বললেন তিনি। তার স্নিগ্ধ, মিষ্টি হাসিতে ঘরে একটা অন্যরকম আবহ তৈরি হলো। “ঠিক আছে আসি। কাল দেখা হবে।” অফিস থেকে দ্রুত বের হয়ে গেলেন তিনি।


পরের দিন

পরের দিনের সেই দেখা আর হয়নি। অন্য এক কাজে অফিসের বাইরে গিয়েছিলেন ইকবাল করিম, তার মোবাইল ফোন বন্ধ ছিলো। এই সময়ের মধ্যে উনি কাজ সেরে চলে গেছেন। বিকেলে অফিসে আসলে অফিস সহকারী বলেন, “স্যার, গতকালের আপা আজকেও বারোটার দিকে অফিসে আইছিলো। আপনার খোঁজ করলো। আমি উনার কাজ করে দিছি।”

বিকেল পাঁচটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে টেলিফোন বেজে উঠল। রিসিভার তুলতেই গতকালের সেই লেডির কণ্ঠস্বর।

“অফিসে আছেন?” খুব মিষ্টি করে জিজ্ঞাসা করলেন।

“অফিসেই আছি। আসবেন নাকি?”

“আপনার সময় থাকলে আসতে পারি।”

“অসুবিধা নেই। চলে আসেন।”

গতকাল তিনি এসেছিলেন ম্যাজেন্টা কালারের একটা সুতির শাড়ি পরে। আজকে পরেছেন একটা খয়েরি রঙের জামদানি শাড়ি। আজকে উনাকে আরও সুন্দরী মনে হচ্ছে। অনেকক্ষণ কথা বললেন। উনি গল্প লেখেন। অফিস থেকে যাওয়ার সময় উনার লেখা দুটো গল্প ইকবাল করিমকে দিলেন পড়ে মতামত জানানোর জন্য।

ভদ্রমহিলা একটা সরকারি অফিসের কর্মকর্তা। গ্রামের বাড়ি মেহেরপুর। এই শহরে এসেছেন তিন বছর হলো, তার আগে ছিলেন রংপুর।


সাত দিন পর

সাত দিন পর ওই একই সময়ে টেলিফোন বেজে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে ইকবাল করিমের মনে হল ওই লেডি কর্মকর্তা ফোন করেছেন। রিসিভার তুলতেই সেই মায়াবী কণ্ঠস্বর — “কেমন আছেন?”

আপনার মতো রূপসী নারী কোনো পুরুষকে যদি এইভাবে জানতে চায় সে কেমন আছে, তাহলে কার সাধ্য যে বলবে খারাপ আছে? ইকবাল করিম একটু রসিকতা করলেন। এই কথায় বাড়তি কোনো মনোযোগ না দিয়ে জানতে চাইলেন, “গল্প দুটো পড়লেন?”

“হ্যাঁ পড়েছি।”

“ভালো লাগেনি নিশ্চয়?”

“ভালো মন্দ পরে। আপনি লিখে যান।”

এই উত্তরে সম্ভবত তিনি খুশি হতে পারলেন না। “ভালো থাকেন” বলে টেলিফোন রেখে দিলেন। মনে হল এরপর তিনি আর ফোন করবেন না।

ইকবাল করিমের ধারণা মিথ্যা প্রমাণ হল। এর আগে তিনি মোটামুটি সাত দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার ফোন করতেন এবং ফোনগুলো করতেন বিকেল পাঁচটার দিকে। কিন্তু এইবার ব্যতিক্রম হল। দ্বিতীয় দিনের মাথায় বিকেল চারটার দিকে তিনি ফোন করলেন।

“হাতে তেমন কাজ নেই। ভাবলাম, আপনার অফিসে গিয়ে গল্প করে আসি।”

“কোনো অসুবিধা নেই, চলে আসেন।”

তিনি অফিসে আসলেন। মিষ্টি করে হেসে বললেন, “আপনাকে বিরক্ত করলাম না তো?”

“অত ভদ্রতার দরকার নেই। আপনি এসেছেন, আমি খুশি হয়েছি। আপনাকে আজকে বিহারীর চাপ খাওয়াবো। অসুবিধা নেই তো?”

“বিহারীর চাপ আমারও খুব প্রিয়।” টেবিলে রাখা বইগুলো নাড়তে নাড়তে বললেন তিনি।

এর আগে যে কয়বার তিনি এই অফিসে এসেছেন, প্রত্যেকবার শাড়ি পরেছেন। আজকে পরেছেন মেরুন রঙের থ্রি পিস। পোশাকের রঙের সঙ্গে ম্যাচ করে হাতব্যাগ, হাতের চুড়ি এবং কানের দুল পরেছেন। মনে হলো বাসা থেকে সাজগোজ করে এসেছেন — সরাসরি অফিস থেকে আসলে চেহারায় একটা ক্লান্তির ছাপ থাকে, এখন যে সতেজ-প্রাণবন্ত লাগছে সেটা থাকতো না।


জেসমিনের গল্প

আজকে অনেক কথা বললেন, সবই ব্যক্তিগত কথা। মোটামুটি সচ্ছল পরিবারের মেয়ে তিনি। বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন, মা ছিলেন একটা গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। একটা বড় বোন আছে, অনেক আগেই তার বিয়ে হয়ে গেছে।

কলেজে অনার্সে পড়ার সময় একটা ছেলেকে ভালোবাসতেন। গরিবের ছেলে, কিন্তু অত্যন্ত মেধাবী। তাদের একই গ্রামের ছেলে — ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি অনার্স পড়তো। ছুটিতে বা অন্যান্য উপলক্ষে বাড়ি আসলে দুইজন নানা জায়গায় বেড়াতেন আর ভবিষ্যৎ সংসারের গল্প সাজাতেন।

গরিবের ছেলে হওয়ায় তাকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন তিনি। প্রথম বছর থেকেই ছেলেটা ডিপার্টমেন্টে ফার্স্ট হতেন। যেহেতু বাড়ি থেকে সাহায্য করার কোনো সামর্থ্য ছিল না, তাই টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ মেটাতে হতো। মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হলে তাকে টিউশনি করতে নিষেধ করে দেন তিনি। ক্লাস শুরু থেকে পরীক্ষার শেষ দিন পর্যন্ত লেখাপড়ার যাবতীয় খরচ পাঠিয়েছেন তিনি।

এক জন্মদিনে তার বাবা বিশ লক্ষ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনে দিয়েছিলেন। এই সঞ্চয়পত্রের যে মুনাফা আসে সবই তার নিজস্ব অ্যাকাউন্টে জমা হয়, কেউ দেখার নেই। সেই টাকা থেকে তার প্রেমিকের লেখাপড়ার খরচ পাঠাতেন। একটা জিনিস তিনি উপলব্ধি করেছেন — ভালোবাসার মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে সেটা অপার সুখের এক উপলক্ষ হয়।

সময় করে তিনি ঢাকা যেতেন। যে তিন-চারদিন তিনি ঢাকায় থাকতেন, মনে হতো স্বর্গের সুখ এর চেয়ে বেশি কিছু না।

মাস্টার্সে সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়। অনার্স শেষ করেই সে বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং মাস্টার্সের রেজাল্টের ছয় মাস পরে বিসিএস পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়। সবাইকে অবাক করে দিয়ে ওই ছেলে ফরেন অ্যাফেয়ার্স ক্যাডারে সিলেক্ট হয়।

যেদিন রেজাল্ট বের হয় সেদিন প্রায় সারারাত দুইজন মোবাইলে কথা বলেন। কত ভালোবাসা! অনেক স্বপ্নের জাল বোনেন দুজন মিলে! ওকে দেখতে ইচ্ছে করে খুব। এর আগে তো কতবারই দেখেছেন, কত ঘুরে বেরিয়েছেন — কিন্তু কিছুই আর মনে নেই যেন, সবকিছুই মনে হচ্ছে নতুন। সিদ্ধান্ত হয় আগামী সপ্তাহে তিনি ঢাকা যাবেন।


সাগরের বিশ্বাসঘাতকতা

পরের দিন ঘুম ভাঙে অনেক দেরিতে। ওকে ফোন করেন, কিন্তু ফোন বন্ধ পান। ভাবলেন, ফোন বন্ধ করে হয়তো ঘুমিয়ে আছে ও। অবাক ব্যাপার হলো, সারাদিনই ওর ফোন বন্ধ পেলেন। রাত দশটার দিকে ফোনে একবার পেলেন, কিন্তু বেশি কথা হলো না। এভাবে কথা ধীরে ধীরে কমে যেতে লাগলো।

ভদ্রমহিলার নাম জেসমিন আক্তার। যে ছেলেটাকে তিনি ভালোবাসতেন তার ডাকনাম সাগর। জেসমিন অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেন, সাগর আজকাল নিজে থেকে ফোন দেয় না। জেসমিন বুঝে যায়, সে তাকে এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। জেসমিনও ফোন করা বন্ধ করে দেয়।

এভাবে চলার মধ্যেই একদিন জেসমিন জানতে পারে, সাগর ঢাকার এক ধনী ব্যবসায়ীর মেয়েকে বিয়ে করেছে।

এই সংবাদ শোনার পরের দিন জেসমিন এক বেসরকারি কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত এক ছেলেকে বিয়ে করে ফেলে। ছেলেটার বাড়ি উত্তরবঙ্গের কোনো এক জেলায়, মেহেরপুর ছিলো তার কর্মস্থল। আগে থেকেই তার সঙ্গে পরিচয় ছিল জেসমিনের। খুবই সুদর্শন পুরুষ — ঘটকের মাধ্যমে জেসমিনকে বিয়ের প্রস্তাবও পাঠিয়েছিলেন।


ঘনিষ্ঠতা

ইকবাল করিমের সাথে ইদানিং খুব ঘন ঘন জেসমিনের দেখা হয়। প্রতিদিনই মানসিকভাবে জেসমিনের টেলিফোনের অপেক্ষায় থাকেন তিনি। জেসমিনের একটি মেয়ে আছে — মেয়েটা সরকারি গার্লস স্কুলে পড়ে। কথা প্রসঙ্গে ইকবাল করিম এটাও জেনে গেছেন, স্বামীর সাথে জেসমিনের সম্পর্ক খুবই শীতল।

তখন বেলা তিনটা। টেলিফোন বেজে উঠলো — জেসমিনের ফোন।

“এই অসময়ে?” রিসিভার তুলেই প্রশ্ন করলেন ইকবাল করিম।

“চলেন ঘুরে আসি।”

“কোথা থেকে?”

“যেখানে খুশি।”

“বগুড়ায় আমার কোথাও যাওয়া বাকি নেই। আপনি যেখানে যেতে চান সেখানেই যাবো।”

সিএনজি নিয়ে দুইজন শারিয়াকান্দি প্রেম যমুনা ঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। এটা যমুনা নদীর একটি শাখা। শুকনো মৌসুমে পানি থাকে না, তবে বর্ষার সময় মূল নদীর সাথে একাকার হয়ে যায়। বন্যার ভাঙনের হাত থেকে রক্ষাকল্পে ইটের ব্লক দিয়ে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এর নাম প্রেম যমুনার ঘাট কীভাবে হলো তা কেউ বলতে পারে না।

শারিয়াকান্দি যাওয়ার পথে সাবগ্রাম নামক এক স্থানে খুব নামকরা দুধ চা পাওয়া যায়। সেই চা খেতে তারা একটা বিরতি নিলেন।

চায়ে চুমুক দিয়ে জেসমিন আচমকা জিজ্ঞাসা করলেন, “ভাবি কেমন আছে?”

“হঠাৎ ভাবির কথা?” হাসতে হাসতে জানতে চাইলেন ইকবাল করিম।

“কোনো কারণ নেই, এমনিই।”

“তাহলে বলি শোনেন। গতকাল দিনের বেলায় গোসলের আগে তার জোরাজুরিতে হয়ে গেলো। একবার নয়, পরপর দুইবার।” দুষ্টুমি করে জবাব দিলেন ইকবাল করিম।

জেসমিন কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেলো।

প্রেম যমুনার ঘাট থেকে নৌকায় করে মাঝ নদীতে ঘুরে বেড়ালেন দুইজন। ঘাট থেকে কিছুদূর গিয়ে একটা কাশবনের পাড় রয়েছে — বর্ষায় সেই পাড় ডুবে মূল নদীর সাথে একাকার হয়ে গেছে। নৌকা ওই কাশবনের ভিতর দিয়ে বয়ে চললো, অসাধারণ রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা। কিন্তু যে উৎসাহ নিয়ে জেসমিন এসেছিলেন, কেন জানি তার মধ্যে সেই উৎসাহের ছিটেফোঁটা নেই। একটা শীতল আবহের মধ্যে ভ্রমণটা শেষ হলো।


নীরবতা

প্রায় একমাস পার হয়ে গেছে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে জেসমিন আর ফোন করেনি। ইকবাল করিম কয়েকবার জেসমিনের মোবাইলে ফোন দিয়েছিলেন, রিসিভ হয়নি। ইকবাল করিম বুঝতে পারেন না, হঠাৎ জেসমিন চুপ হয়ে গেলেন কেন। তিনি প্রতিদিনই তার ফোনের অপেক্ষায় থাকেন। বিশেষ করে বিকেলে কোনো ফোন আসলেই তার হৃদপিণ্ড কেঁপে ওঠে — হয়তো জেসমিনের ফোন।

তারও বেশ কিছুদিন পরে জলেশ্বরিতলার এক শোরুমে হঠাৎ করে জেসমিনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় ইকবাল করিমের। তাকে দেখেও না দেখার ভান করে শোরুম থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলেন।

“চলে যাচ্ছেন যে?” ইকবাল করিম জিজ্ঞাসা করলেন।

“আমার কাজ শেষ। আপনি ভালো আছেন?”

জেসমিনকে বিষণ্ন দেখায়।

“হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেলেন। কোনো যোগাযোগ নেই।”

“যোগাযোগের কি দরকার? সুখেই তো আছেন।”

আর কোনো কথা না বলে শোরুম থেকে বের হয়ে গেলেন জেসমিন আক্তার

মন্তব্য